তিন ভাগে বিভক্ত আওয়ামী লীগের ভোট

তিন ভাগে বিভক্ত আওয়ামী লীগের ভোট

সমাচার ডেস্ক: কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়েই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তবে নির্বাচন থেকে দলটি বাইরে থাকলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তাদের ভোটব্যাংক। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, আওয়ামী লীগের ভোটাররা তিনটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ছেন।

একটি অংশ ঝুঁকছেন বিএনপির দিকে, আরেকটি অংশ জামায়াতে ইসলামীর দিকে, আর বড় একটি অংশ ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকতে চান। এই বিভাজনই আসন্ন নির্বাচনে বড় রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিএনপি-জামায়াতের টার্গেট আওয়ামী লীগের ভোট

নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকলেও তাদের ভোট বিএনপি ও জামায়াতের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দুই দলই ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে আওয়ামী লীগের ভোটারদের নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা করছে। স্থানীয় প্রভাব, সাংগঠনিক শক্তি এবং নিরাপত্তার আশ্বাস-এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে মাঠপর্যায়ে চলছে নীরব সমীকরণ।

খুলনা, গোপালগঞ্জ, সিলেট, চাঁদপুরসহ বাংলানিউজের বিভিন্ন জেলা প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, যেসব এলাকায় বিএনপি সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী, সেসব এলাকায় আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ বিএনপির প্রার্থীদের দিকে ঝুঁকছে। আবার যেসব এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর প্রভাব তুলনামূলক বেশি, সেখানে আওয়ামী লীগের ভোটারদের একটি অংশ জামায়াতের প্রার্থীদের প্রতি সহানুভূতিশীল অবস্থান নিচ্ছেন। এ ছাড়া ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে বিএনপি এবং জামায়াতের নেতাকর্মীরা ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করেছে, তার ওপরও নির্ভর করছে অনেক কিছু।

আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের অবস্থান: ভোট বর্জনের কৌশল
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের অবস্থান একেবারেই ভিন্ন। দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব চাইছেন, আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচনে ভোটকাস্টিং যেন কম হয়। তাদের ধারণা, ভোটার উপস্থিতি কম হলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা দলের নেতাকর্মী ও সমর্থক ভোটারদের এই নির্বাচনে ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভার্চ্যুয়াল প্ল্যাটফর্মে তিনি একাধিকবার এ বিষয়ে কথা বলেছেন। তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়সহ দলের আরও কয়েকজন নেতা একই আহ্বান জানিয়েছেন। দলটির নেতারা মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও অন্যান্য ভার্চ্যুয়াল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অনানুষ্ঠানিকভাবে সিদ্ধান্ত ও দিকনির্দেশনা কর্মীপর্যায়ে পৌঁছে দিচ্ছেন।

এলাকাভিত্তিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। কোনো কোনো আসনে আওয়ামী লীগের কর্মীরা বিএনপি বা জামায়াত প্রার্থীদের কাছ থেকে নিরাপত্তার আশ্বাস পেয়ে তাদের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। রাজনৈতিক বাস্তবতা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও স্থানীয় সমীকরণ—সবকিছু মিলিয়েই আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন কতটা হবে, তা নিয়ে সংশয় আছে।

তবে আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, ভোটের আগে শেষ মুহূর্তে এর ব্যতিক্রম একটি নির্দেশও আসতে পারে। দলের ভবিষ্যৎ রাজনীতি, অস্তিত্ব ও নেতাকর্মী-সমর্থকদের অবস্থার কথা চিন্তা করে নতুন কোনো সিদ্ধান্তের কথা তাদের জানানো হতে পারে। কর্মী-সমর্থকরা বিভ্রান্ত হলে এবং নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নিলে সেটা দলের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে—এমনটাও ভাবা হচ্ছে। এই ভাবনা থেকেই এ ব্যাপারে দলের উচ্চপর্যায়ের নেতারা চিন্তাভাবনা করছেন। পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দলের কর্মী-সমর্থক ভোটারদের অনেকেই ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারবেন না। যারা ভোট দিতে যাবেন, সেক্ষেত্রে তারা যাতে কোনো এক দলকে ভোট দেন বা তাদের ভোট একদিকে থাকে, সে ধরনের পরামর্শ আসতে পারে বলে জানা গেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষণে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক বরাবরই বড় একটি ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত। ১৯৭৫ সালের পর ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমে ক্ষমতায় ফেরে আওয়ামী লীগ। ওই নির্বাচনে দলটি পায় ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ ভোট এবং সংসদে ১৪৬টি আসন। ২০০১ সালের নির্বাচনে আসনসংখ্যা কমে ৬২ হলেও ভোটের হার ছিল ৪০ দশমিক ২ শতাংশ। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৪৮ দশমিক ৪ শতাংশ ভোট পেয়ে আবার ক্ষমতায় আসে। এসব পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে রাজনৈতিক মহলের ধারণা, আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যগত ভোট এখনো ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। বর্তমান বাস্তবতায় সেই ভোট কমলেও অন্তত ২৫ শতাংশ ভোট এখনো আওয়ামী লীগের সঙ্গে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এই ভোটই আগামী নির্বাচনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে ২৯৯ আসনের ভোটে ৬০টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে ৫০টি দল অংশগ্রহণ করছে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য মতে, এতে দলের প্রার্থী রয়েছে ১ হাজার ৭৫৫ জন। স্বতন্ত্র ২৭৩ জন। নারী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা ৮৩ জন। এরমধ্যে দলীয় প্রার্থীর সংখ্যা ৬৩ জন। বাকি ২০ জন হচ্ছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। ভোটে পুরুষ প্রার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ৯৪৬ জন। এর মধ্যে ১ হাজার ৬৯২ জন দলীয় প্রার্থী। পুরুষদের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৫৩ জন। শেরপুর-৩ আসনে একজন প্রার্থী মারা যাওয়ায় ভোট স্থগিত করেছে কমিশন, যেখানে পরবর্তীতে নতুন তফসিলের মাধ্যমে নির্বাচন সম্পন্ন করবে ভোট আয়োজনকারী সংস্থাটি।

..

Leave a reply

Minimum length: 20 characters ::