দুদকের বিরুদ্ধে ‘মামলা করার কথা ভাবছেন’ টিউলিপ

দুদকের বিরুদ্ধে ‘মামলা করার কথা ভাবছেন’ টিউলিপ

সমাচার ডেস্ক: প্লট দুর্নীতির মামলায় বাংলাদেশের আদালতে দণ্ডিত ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিক বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করার কথা ভাবছেন বলে খবর দিয়েছে একটি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম।

তার ঘনিষ্ঠ একজনের বরাত দিয়ে হিন্দুস্থান টাইমস এক প্রতিবেদনে লিখেছে, বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্নি টিউলিপ বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করার ‘আইনি পরামর্শ নিচ্ছেন’।

পূর্বাচলে টিউলিপের মা শেখ রেহানার নামে ১০ কাঠার একটি প্লট বরাদ্দে দুর্নীতির অভিযোগে গত বছরের ১ ডিসেম্বর ঢাকার একটি আদালত এই ব্রিটিশ এমপিকে ২ বছরের কারাদণ্ড দেয়।

ওই মামলায় শেখ রেহানার ৭ বছর কারাদণ্ড এবং টিউলিপের খালা শেখ হাসিনাকে ৫ বছর কারাদণ্ড দেয় ঢাকার চতুর্থ বিশেষ জজ আদালত।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তার ও আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ এক ডেভেলপারের কাছ থেকে লন্ডনে ৭ লাখ পাউন্ড দামের একটি ফ্ল্যাট ‘উপহার’ পাওয়ার খবর নিয়ে সমালোচনার মধ্যে গত জানুয়ারিতে যুক্তরাজ্যের প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন টিউলিপ সিদ্দিক।

তার আগে আওয়ামী লীগের পতনের পরপর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগেও টিউলিপের নাম আসে। বিষয়টি নিয়ে সে সময় ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে তোলপাড় শুরু হয়। এরপর টিউলিপ ও তার বোনের পাওয়া ‘উপহারের’ ফ্ল্যাট নিয়ে শুরু হয় তুমুল আলোচনা।

মা-বাবার কাছ থেকে পাওয়া গুলশানের একটি ফ্ল্যাট টিউলিপ সিদ্দিক তার বোন রূপন্তীকে ২০১৫ সালে হস্তান্তর করেন। তবে সেই হস্তান্তরে যে নোটারি ব্যবহার করা হয় তা তদন্তে ‘ভুয়া’ প্রমাণিত হওয়ার কথা বলেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

লন্ডনের হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড হাইগেটের আসনের লেবার এমপি টিউলিপ টিউলিপ সিদ্দিক এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

তাকে আইনি সহায়তা দেওয়া যুক্তরাজ্যভিত্তিক ল ফার্ম স্টেফেনসন হারউড বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনকে সতর্ক করে বলেছে, ‘মিথ্যা ও মানহানিকর অভিযোগ’ এবং তার ফলে নিজের ক্ষতির বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার পূর্ণ অধিকার তাদের মক্কেল রাখেন।

দুদকের আনা অভিযোগকে টিউলিপের ‘খ্যাতি নষ্ট করার’ এবং জনপ্রতিনিধি হিসেবে তার কাজকে ‘বাধাগ্রস্ত’ করার ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ ও ‘অবৈধ প্রচার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন তার আইনজীবীরা।

দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন দাবি করে আসছেন, কমিশনের তদন্তে পাওয়া তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই টিউলিপ দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন।

এ বিষয়ে হিন্দুস্থান টাইমস লিখেছে, “আদালতের রায়ের পর দুদকের একজন প্রসিকিউটর সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, কিছু ব্যক্তি তাদের শোনা কথার ভিত্তিতে টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন, যা মোমেনের দাবির বিপরীত। টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ্য দলিল উপস্থাপিত হয়নি এবং সাক্ষ্যগুলো গ্রহণযোগ্য কিনা তা স্পষ্ট করা হয়নি।”

টিউলিপের আইনজীবীরা বলছেন, ২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি একজন ব্রিটিশ সাংবাদিককে পাঠানো একটি মিডিয়া নোটে দুদক বলে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প ( যে কাজ পেয়েছে রাশিয়ার কোম্পানি) থেকে প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিভিন্ন মালয়েশিয়ার ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ‘পাচার’ করা হয়েছে, যার সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার ছেলে সাজীব ওয়াজেদ জয় এবং টিউলিপ সিদ্দিক জড়িত।

“নোটে আরও বলা হয়, টিউলিপ সাত লাখ পাউন্ড দামের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট পেয়েছেন, যা বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প, বিশেষ করে রূপপুর প্রকল্পে দুর্নীতির অংশ হিসাবে পাওয়া।”

স্টেফেনসন হারউড দুদককে বলেছে, তাদের ওই মিডিয়া নোট মূলত অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে, কিন্তু কে এই অভিযোগ করেছে বা কোথায় এবং কখন–সেসব বলা হয়নি।

টিউলিপের আইনজীবীরা জোর দিয়ে বলেছেন, এই ব্রিটিশ এমপি রূপপুর প্রকল্পের জন্য বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে চুক্তিতে কোনোভাবে জড়িত ছিলেন না। তিনি যুক্তরাজ্যে সাত লাখ পাউন্ড দামের কোনো ফ্ল্যাটও পাননি।

এই ল ফার্ম বলছে, লন্ডনের কিংস ক্রসের একটি ফ্ল্যাট ২০০৪ সালে টিউলিপকে উপহার দেওয়া হয়েছিল। তবে সেটা রূপপুর চুক্তির প্রায় ১০ বছর আগে। ২০০৪ সালে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন না। টিউলিপ সেই উপহারের কথা ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দেওয়া সম্পদের বিবরণীতে ঘোষণাও করেছিলেন।

সেখানে বলা হয়, ওই ফ্ল্যাটদাতার নাম আব্দুল মোতালিফ, যিনি ২০০১ সালে ১ লাখ ৯৫ হাজার পাউন্ড দিয়ে ওই সম্পত্তি কিনেছিলেন। টিউলিপের বিয়ের সময় তিনি ওই ফ্ল্যাট উপহার দিয়েছিলেন।

ফ্ল্যাট নিয়ে বিতর্কের মধ্যে ২০২৫ সালের ১৪ জানুয়ারি ব্রিটেনের আর্থিক সেবা বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের ঘনিষ্ঠ রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত টিউলিপ।

প্রধানমন্ত্রী স্টারমার তার পদত্যাগ গ্রহণের সময় বলেছেন, ব্রিটিশ সরকারের ইনডিপেনডেন্ট এথিকস অ্যাডভাইজর (স্ট্যান্ডার্ডস ওয়াচডগ) স্যার লাউরি ম্যাগনাস নিশ্চিত করেছেন যে, তিনি (টিউলিপ) মন্ত্রী হিসেবে কোনো নিয়ম লঙ্ঘন করেননি।

এরপর ১৩ এপ্রিল দুদকের আবেদনে প্লট দুর্নীতির মামলায় টিউলিপের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে ঢাকার আদালত।

এর দুই দিন পর স্টেফেনসন হারউডের পক্ষ থেকে দুদক চেয়ারম্যান মোমেনকে লেখা এক চিঠিতে বলা হয়, দুদকের আচরণ ‘ন্যায্য প্রক্রিয়া ও আইনগত পদ্ধতির বিপরীত’। টিউলিপ সিদ্দিক বা তার আইনজীবীর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ না করেই এ মামলা চালিয়ে নিচ্ছে দুদক, যা ‘আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের লঙ্ঘন’।

ওই মামলার রায়ের আগে বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন যুক্তরাজ্যের পাঁচজন শীর্ষস্থানীয় আইনজীবী।

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে লেখা এক চিঠিতে তারা বলেন, সাবেক প্রতিমন্ত্রী টিউলিপ সিদ্দিক এই মামলা লড়ার “ন্যূনতম অধিকারও পাননি”; অভিযোগ সম্পর্কে যথাযথ ধারণা বা আইনজীবীর নিয়োগের সুযোগ–“কিছুই তিনি পাননি।”

বাংলাদেশে চলমান মামলাকে ‘সাজানো’ এবং ‘অন্যায্য’ হিসেবে বর্ণনা করা হয় ওই চিঠিতে, যা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান।

ওই পাঁচ আইনজীবীর মধ্যে ছিলেন রবার্ট বাকল্যান্ড, যিনি বরিস জনসনের কনজারভেটিভ সরকারের আমলে যুক্তরাজ্যের বিচার মন্ত্রী ছিলেন। আরো ছিলেন ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের স্ত্রী শেরি ব্লেয়ার, ডমিনিক গ্রিভ, ফিলিপ স্যান্ডস, জিওফ্রি রবার্টসন।

টিউলিপকে পলাতক দেখিয়ে বিচার প্রক্রিয়া শেষে ১ ডিসেম্বর তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং তাকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেয় ঢাকার আদালত।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, “শেখ রেহেনা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্ররোচিত করে পূর্বাচল আবাসিক প্রকল্পে প্লট নিয়েছেন। টিউলিপ সিদ্দিক তার মা রেহানা সিদ্দিককে প্লট পাইয়ে দেওয়ার জন্য তার খালা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ও শেখ হাসিনার একান্ত সচিব সালাউদ্দিনকে মোবাইল ও ইন্টারনেটের বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে এবং বাংলাদেশে এলে সরাসরি যোগাযোগ করেছেন।

“দুজন সাক্ষীর সাক্ষ্য এবং তাদের জবানবন্দিতে প্রমাণিত হয়েছে। আসামি শেখ হাসিনা সকল আইন ও বিধিবিধান লঙ্ঘন, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির মাধ্যমে তার নিয়ন্ত্রণাধীন অধীনস্থ কর্মকর্তা, কর্মচারী থেকে প্রভাবিত করে দুর্নীতির মাধ্যমে তার প্লট বরাদ্দ প্রদানের ব্যবস্থা করে দিয়ে ফৌজদারী অসদাচরণ করেছে। এই তিনজন বাদে অপর আসামিরা পাবলিক সার্ভেন্ট। তারা বিধি-বিধান লঙ্ঘন করে প্লট বরাদ্দ পেতে সহায়তা করেছেন।”

‘প্রিভেনশন অব করাপশন অ্যাক্ট ১৯৪৭’–এর ৫(২) ধারা এবং দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় টিউলিপকে দোষী সাব্যস্ত করেছে আদালত।

হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন মাধ্যমে টিউলিপি সিদ্দিকের ‘যোগাযোগ’ করার যে কথা আদালত বলেছে, সে প্রসঙ্গে এক প্রশ্নে দুদকের কৌঁসুলি খান মো. মাইনুল হাসান লিপন সেদিন বলেন, “টিউলিপ সিদ্দিক ব্রিটিশ পার্লামেন্টের একজন মেম্বার হিসেবে অধিকতর ক্ষমতার অধিকারী হয়ে তাহার খালা শেখ হাসিনাকে প্রভাবিত করেছেন।

“যেহেতু শেখ হাসিনা ইতোপূর্বে তার নিজের নামে এবং তার দুই সন্তানের নামে তিনটি প্লট নিয়েছিলেন, সেইজন্য টিউলিপি সিদ্দিক তার খালাকে এই কথা বলেই প্রভাবিত করেছিলেন যে, ‘যেহেতু আপনি তিনটি প্লট নিয়েছেন, আমার মা এবং ভাই বোনদেরকেও তিনটি প্লট দিতে হবে’।”

গণভবনের দুজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাক্ষ্যে বিষয়টি উঠে আসার কথা বলেন দুদকের আইনজীবী। তিনি বলেন, “বিভিন্ন অ্যাপ এবং টেলিফোনের মাধ্যমে, দেশে এসে, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর যে একান্ত সচিব ছিলেন, সালাউদ্দিন সাহেব, তার মাধ্যমেও প্রভাবিত করেছেন।

“এইভাবে তার প্রভাবিত করার বিষয়টা প্রমাণিত হওয়ায় আদালত তাকে দুই বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেছে।”

হিন্দুস্থান টাইমস লিখেছে, রায়ের দিন সাংবাদিকরা জানতে চেয়েছিলেন, টিউলিপের কোনো মেসেজের স্ক্রিনশট আছে কি না। জবাবে দুদকের একজন প্রসিকিউটর বলেন, সাক্ষীরা আদালতে ওই মেসেজের কথা বলেছেন।

টিউলিপ সিদ্দিক এ রায়কে ‘প্রহসন’ হিসেবে বর্ণনা করেন সেদিন। তার বাংলাদেশের আদালতের বিচারের ‘আইনি প্রতিনিধিত্বের সুযোগ না দেওয়ার’ কথা তুলে ধরে এই রায়কে ‘স্বীকৃতি’ না দেওয়ার কথা বলে টিউলিপের দল লেবার পার্টি।

দলটির একজন মুখপাত্র সেদিন বলেন, “কোনো অভিযোগ আনা হলে অভিযুক্ত ব্যক্তির আইনগত প্রতিরক্ষা উপস্থাপনের সুযোগ পাওয়া উচিত, কিন্তু এই ক্ষেত্রে তা হয়নি। সেজন্যই আমরা এই রায়কে স্বীকৃতি দিতে পারি না।”

..

Leave a reply

Minimum length: 20 characters ::