এক যুগ পেরিয়েও রহস্যের জট খুলল না: সাগর–রুনি মামলায় ১২৪ দফা বিলম্ব

এক যুগ পেরিয়েও রহস্যের জট খুলল না: সাগর–রুনি মামলায় ১২৪ দফা বিলম্ব


‎কোর্ট রিপোর্টার: প্রতিবেদন না দেওয়ায় তদন্ত কর্মকর্তাকে সশরীরে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ; নতুন তারিখ ১ এপ্রিল, ২০২৬।

‎বহু আলোচিত সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আবারও নির্ধারিত সময়ে আদালতে জমা পড়েনি। ফলে মামলাটির তদন্তে নতুন করে সময় নির্ধারণ করেছেন আদালত। আগামী ১ এপ্রিল ২০২৬ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নতুন দিন ধার্য করা হয়েছে। এ নিয়ে এই মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় ১২৪তমবারের মতো পিছিয়ে গেল, যা দীর্ঘসূত্রতার নতুন রেকর্ড বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

‎সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুর রহমান এ আদেশ দেন। নির্ধারিত তারিখে প্রতিবেদন দাখিল না হওয়ায় আদালত অসন্তোষ প্রকাশ করে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আজিজুল হককে পরবর্তী তারিখে সশরীরে আদালতে হাজির হয়ে বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করতে নির্দেশ দেন। আদালত জানতে চান, এতদিনেও তদন্ত শেষ না হওয়ার পেছনে কী কী প্রতিবন্ধকতা রয়েছে এবং তদন্তের বাস্তব অগ্রগতি কতদূর।
‎সেদিন মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন থাকলেও আদালতে কোনো প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়নি। এতে বিচারক নতুন তারিখ ধার্য করার পাশাপাশি তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে লিখিত ও মৌখিক ব্যাখ্যা চেয়েছেন। আদালত সূত্রে জানা গেছে, পরবর্তী তারিখে তদন্ত কর্মকর্তাকে হাজির হয়ে মামলার বর্তমান অবস্থা বিস্তারিত তুলে ধরতে হবে।
‎মামলার এজাহারভুক্ত আসামিরা হলেন—রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মাসুম মিন্টু, কামরুল ইসলাম ওরফে অরুন, আবু সাঈদ, নিহত দম্পতির বাসার নিরাপত্তারক্ষী পলাশ রুদ্র পাল ও এনায়েত আহমেদ এবং তাদের পরিচিত তানভীর রহমান খান।

‎এর মধ্যে তানভীর রহমান খান ও পলাশ রুদ্র পাল জামিনে মুক্ত রয়েছেন। অন্য আসামিরা বর্তমানে কারাগারে আটক আছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
‎২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের নিজ বাসায় নির্মমভাবে খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সারোয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। ঘটনার পরদিন নিহত রুনির ভাই নওশের আলম রোমান শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। দেশের গণমাধ্যম অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করা এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য আজও পুরোপুরি উদঘাটিত না হওয়ায় সাংবাদিক সমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ রয়ে গেছে।
‎মামলার প্রাথমিক তদন্ত শুরু হয় সংশ্লিষ্ট থানার এক উপ-পরিদর্শকের মাধ্যমে। চার দিন পর তদন্তভার দেওয়া হয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)-কে। দুই মাসের বেশি সময় তদন্ত করেও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় হাইকোর্টের নির্দেশে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল মামলাটি র‌্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপরও দীর্ঘ সময় তদন্ত চললেও উল্লেখযোগ্য ফল না আসায় আদালত বারবার অগ্রগতি প্রতিবেদন চেয়েছেন।

‎মামলাটির তদন্তে গতি আনতে গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট বিভিন্ন সংস্থার অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে ১৭ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করে পিবিআই প্রধানকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। তদন্তের অগ্রগতি তদারকি, তথ্য-উপাত্ত সমন্বয় এবং দ্রুত প্রতিবেদন প্রস্তুতের লক্ষ্যে এই টাস্কফোর্স কাজ করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

‎এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বহুল আলোচিত এই হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন এখনও আদালতে জমা না পড়ায় বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে হতাশা আরও বাড়ছে। তদন্তে বারবার সময় বৃদ্ধি, নির্ধারিত দিনে প্রতিবেদন দাখিল না হওয়া এবং তদন্ত কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা দিতে তলবের ঘটনায় মামলাটির অগ্রগতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
‎আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকদের মতে, তদন্ত দ্রুত শেষ করে আদালতে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করা এখন সময়ের দাবি।

‎আদালত আগামী ১ এপ্রিলের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। একই দিনে তদন্ত কর্মকর্তা সশরীরে হাজির হয়ে বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করবেন বলে জানা গেছে। বিচারপ্রার্থীদের প্রত্যাশা—দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের পথে দৃশ্যমান অগ্রগতি আসবে।

..

Leave a reply

Minimum length: 20 characters ::