মোঃ আবু সুফিয়ান: বিদ্যুৎ আমাদের আধুনিক জীবনের অন্যতম অপরিহার্য উপাদান। শিল্প উৎপাদন, অফিস-আদালত, বাসা-বাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে চিকিৎসা সেবা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিদ্যুতের ব্যবহার অপরিসীম। কিন্তু এই অপরিহার্য শক্তির সঠিক ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তা পরিণত হচ্ছে নীরব ঘাতকে। দেশে দিন দিন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবছর বাংলাদেশে অসংখ্য মানুষ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন এবং আরও অনেকেই গুরুতর আহত হচ্ছেন। বিভিন্ন গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর প্রায় এক হাজার মানুষ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যায় এবং হাজার হাজার মানুষ অ-মারাত্মক আঘাতে আক্রান্ত হন। কর্মক্ষেত্রেও এ ধরনের দুর্ঘটনা কম নয়; বিশেষ করে বিদ্যুৎ সংযোগ মেরামত বা স্থাপন কাজের সময় কর্মীদের মৃত্যুর ঘটনা আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। পাশাপাশি বিদ্যুৎজনিত অগ্নিকাণ্ডেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রাণহানি ঘটছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও বাড়িয়ে তুলছে।
বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার পেছনে বেশ কিছু সাধারণ কারণ রয়েছে, যেগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অবহেলা ও অসচেতনতার ফল। অপর্যাপ্তভাবে বৈদ্যুতিক সংযোগ স্থাপন, খোলা তার বা প্লাগ শিশুদের নাগালে রাখা, ভেজা হাতে বৈদ্যুতিক যন্ত্র স্পর্শ করা, খালি পায়ে বিদ্যুৎ সংযোগের কাছে যাওয়া কিংবা ঝড়-বৃষ্টির সময় অসতর্কভাবে বাইরে অবস্থান—এসবই ঝুঁকিকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। এমনকি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ব্যক্তিকে সরাসরি স্পর্শ করার মতো ভুলও অনেক সময় আরও বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তবে সচেতনতা ও দ্রুত পদক্ষেপের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে প্রাণহানি রোধ করা সম্ভব। কেউ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলে প্রথমেই মেইন সুইচ বন্ধ করতে হবে। তা সম্ভব না হলে শুকনা কাঠ, কাগজ বা রাবারের সাহায্যে তাকে বিদ্যুতের উৎস থেকে আলাদা করতে হবে। কখনোই সরাসরি হাত দিয়ে স্পর্শ করা উচিত নয়। এরপর আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃদস্পন্দন পরীক্ষা করে প্রয়োজন হলে সিপিআর ও কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা করতে হবে এবং দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
প্রতিরোধই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর উপায়। ভেজা হাতে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার থেকে বিরত থাকা, বৈদ্যুতিক কাজের সময় রাবারের জুতা ব্যবহার করা, শিশুদের নাগালের বাইরে সংযোগ রাখা এবং যেকোনো মেরামত কাজের আগে মেইন সুইচ বন্ধ করা—এসব সাধারণ সতর্কতা অনেক বড় দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, বিদ্যুতের ব্যবহার যত বাড়ছে, ততই বাড়াতে হবে আমাদের সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ। ব্যক্তি, পরিবার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ—সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে নিরাপদ বিদ্যুৎ ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে। মনে রাখতে হবে, সামান্য অসতর্কতা যেমন প্রাণ কেড়ে নিতে পারে, তেমনি একটু সচেতনতাই বাঁচাতে পারে অমূল্য জীবন।
..