অগ্নি দুর্ঘটনা থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে হবে

অগ্নি দুর্ঘটনা থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে হবে

মো:আবু সুফিয়ানঃ শনিবার (৪ এপ্রিল) ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জের কদমতলী এলাকায় একটি গ্যাস লাইটার কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৬ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, নিহতরা সবাই ওই কারখানার কর্মী। এই মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয়, বাংলাদেশে অগ্নি নিরাপত্তা এখনো কতটা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এ ধরনের দুর্ঘটনা আমাদের দেশে নতুন নয়। প্রায় প্রতিটি বড় অগ্নিকাণ্ডের পরই উঠে আসে একই চিত্র—নিয়ম না মানা, অব্যবস্থাপনা এবং মালিকপক্ষের উদাসীনতা। কদমতলীর এই কারখানাটিও ছিল টিনের তৈরি ঝুপড়ি ঘরের মতো, যেখানে ন্যূনতম অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। কার্যকর অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, স্মোক ডিটেক্টর, ওয়াটার স্প্রিংকলার কিংবা জরুরি বহির্গমন পথ-কোনোটিই ছিল না যথাযথভাবে। ফলে আগুন লাগার পর শ্রমিকদের বের হওয়ার সুযোগ না থাকায় হতাহতের ঘটনা ঘটে।

জানা গেছে, এর আগেও একই কারখানায় আগুন লেগেছিল, কিন্তু এরপরও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো-আগুন লাগার পর আশপাশের প্রায় ৫০টি বাড়িতে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যায়নি। এটি আমাদের নগর ব্যবস্থাপনার বড় ধরনের দুর্বলতারই প্রতিফলন।

এর আগে গত বছরের ১৪ অক্টোবর মিরপুরে একটি কেমিক্যাল গোডাউনে অগ্নিকাণ্ড এবং ১৮ অক্টোবর ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। মাত্র চার দিনের ব্যবধানে পর পর দুটি ভায়াবহ আগুনের ঘটনাকে তখন জনমনে দেখা দিয়েছিলো নানা প্রশ্ন। মিরপুরের ঘটনায় ১৬ জনের মৃত্যুর বিষয়টি যেমন হৃদয়বিদারক, তেমনি বিমানবন্দের কার্গো ভিলেজে দুই হাজার কোটি টাকার বিপুল পরিমাণ রপ্তানি পণ্য, বিশেষ করে পোশাক শিল্পের প্রস্তুত মালামাল পুড়ে যায়।

বাংলাদেশে প্রায় প্রতিটি বড় অগ্নিকাণ্ডের পর তদন্ত কমিটি গঠন হলেও, তার বাস্তবায়ন খুব কম দেখা যায়। ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান ১২৪ জন মানুষ।এরপর ২০১৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভোরে চকবাজারের চুড়িহাট্টার আগুনে ৭৮ জনের মতো মারা যায়। ২০২৩ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বেইলি রোডে একটি ছয়তলা ভবনের রেস্টুরেন্ট থেকে অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৪৬ জনের মৃত্যু হয়।

এছাড়া ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর আশুলিয়ার ‘তাজরিন ফ্যাশন ফ্যাক্টরির’ ৯তলা ভবনে আগুন লেগে প্রাণ হারান ১১২ জন শ্রমিক। ঢাকার উত্তরে টঙ্গীতে একটি সিগারেট তৈরির কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণে আগুনের ঘটনায় ২০১৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর প্রাণ হারান ৩১ জন। ২০১৯ সালের ২৮ মার্চ, রাজধানীর বনানীর বহুতল বাণ্যিজিক ভবন এফআর টাওয়ারে আগুনের ঘটনায় ২৬ জনের মৃত্যু হয়।

প্রতিবারই তদন্ত কমিটি গঠন হয়, প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেই সুপারিশের বাস্তবায়ন খুব কমই দেখা যায়। ফলে অপরিকল্পিত নগরায়ন, কেমিক্যাল গোডাউন, গ্যাস সিলিন্ডারের ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহার এবং অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থার দুর্বলতা-সব মিলিয়ে আমাদের শহর যেন এক “ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি” হয়ে উঠেছে।

অগ্নি দুর্ঘটনা প্রতিরোধে এখন আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই। উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে কেমিক্যাল গোডাউন সরানো, ভবন নির্মাণে অগ্নি নিরাপত্তা বিধি কঠোরভাবে মানা, নিয়মিত ফায়ার মহড়া এবং পরিদর্শন নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রতিটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ফায়ার লাইসেন্স, প্রশিক্ষিত ফায়ার টিম এবং আধুনিক অ্যালার্ম ও স্প্রিংকলার ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

তবে শুধু সরকারের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। নাগরিক সচেতনতা এবং দায়িত্ববোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তা বিধি মানা, ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা সম্পর্কে সতর্ক থাকা এবং প্রয়োজনে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা—এসব ক্ষেত্রেও সবাইকে সক্রিয় হতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—দোষীদের দায় নির্ধারণ করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা। কারণ জবাবদিহিতা না থাকলে পরিবর্তন আসে না। সময় এসেছে কেবল তদন্ত নয়, বাস্তব ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার। একটি নিরাপদ, অগ্নিমুক্ত নগরী গড়াই এখন আমাদের সম্মিলিত প্রত্যাশা।

..

Leave a reply

Minimum length: 20 characters ::