বেলাল হোসেন ভুইয়া: ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি মো. সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে সীমাহীন দুর্নীতি, অনিয়ম ও জাল জালিয়াতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। আইনের তোয়াক্কা না করে প্রায় ২২ বছর ধরে একই পদে বহাল থেকে তিনি সিটি কর্পোরেশনের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন রেকর্ড গড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র বলছে, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের নামে শত কোটি টাকা লোপাট, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অর্থ পাচারের মতো অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের বিষয়ে ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।ইতোমধ্যেই প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) নির্দেশ দিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মাহবুব আইরিন। তিনি এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের সচিবকে নির্দেশ প্রদান করেছেন।
নিয়োগ নিয়েই প্রশ্ন:
ডিএসসিসি সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৭ সালের জুন মাসে তৎকালীন ঢাকা সিটি কর্পোরেশনে একটি স্থপতি (৬ষ্ঠ গ্রেড) পদের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ ছিল কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থাপত্য বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে কমপক্ষে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, মো. সিরাজুল ইসলাম এই শর্তগুলোর কোনোটিই পূরণ করতেন না। তিনি তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ রাশিয়া, বর্তমান ইউক্রেনের খারকভ ইনস্টিটিউট থেকে ১৯৯৪ সালের ৩০ জুন স্থাপত্য বিষয়ে ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করেন। ফলে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের সময় তার পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা থাকার সুযোগই ছিল না। এছাড়া বিদেশি ডিগ্রি সমমান নির্ধারণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) মতামত নেওয়ার নিয়ম থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। এরপরও রহস্যজনকভাবে ১৯৯৭ সালের ২২ ডিসেম্বর তিনি নিয়োগপত্র পান এবং ২৯ ডিসেম্বর স্থপতি পদে যোগদান করেন।
অতিরিক্ত দায়িত্বে দুই দশকের বেশি:
পরবর্তীতে ২০০৪ সালের ১৮ অক্টোবর তৎকালীন ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের এক দাপ্তরিক চিঠির মাধ্যমে তাকে ৪র্থ গ্রেডের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু ২০১১ সালের ১ ডিসেম্বর ঢাকা সিটি কর্পোরেশন বিভক্ত হয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের কার্যক্রম শুরু হলে সেই আদেশ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। অভিযোগ রয়েছে, এরপর আর কোনো বৈধ আদেশ ছাড়াই তিনি দীর্ঘ প্রায় ২২ বছর ধরে ওই পদে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
এ সময়ের মধ্যে সিটি কর্পোরেশনে একাধিক মেয়র ও প্রশাসক পরিবর্তন হলেও তার অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রভাব ও আর্থিক শক্তির বলয় ব্যবহার করেই তিনি পদটি ধরে রেখেছেন।
নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ:
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী অতিরিক্ত দায়িত্ব সাধারণত স্বল্প সময়ের জন্য দেওয়া হয় এবং তা সমপদ বা সমগ্রেডের কর্মকর্তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু সিরাজুল ইসলামের মূল পদ স্থপতি, যার গ্রেড ৬ষ্ঠ। অন্যদিকে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ পদটি ৪র্থ গ্রেডের। এ অবস্থায় দীর্ঘ সময় ধরে ওই পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করা সরকারি নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্পে শত কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ:
অভিযোগ রয়েছে, প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের ক্ষমতা ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম করেছেন সিরাজুল ইসলাম। উন্নয়ন প্রকল্পের নামে শত কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং আর্থিক অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, অভিযোগগুলো সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হলে সিটি কর্পোরেশনের দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
এই অভিযোগগুলোর বিষয়ে সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, একটি কুচক্রী মহল দীর্ঘদিন ধরে তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে সংঘবদ্ধভাবে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব অভিযোগের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই এবং ব্যক্তিগত স্বার্থে কিছু মানুষ তাকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি করার চেষ্টা করছে।
তবে একই পদে দুই দশকের বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি এ বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তার দাবি, তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগই ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
..