আশরাফুল ইসলাম (রাঙ্গাবালী) পটুয়াখালী: শুধু নামেই সংরক্ষিত বন। কিন্তু কাজে যেন ব্যক্তি মালিকানাধীন কোন বনভ‚মি। একের পর এক কাটা পড়ছে গাছ। রাতের আধারে এসব গাছ কাটছে বনখেকোরা। কোন কোন গাছ রাতেই পাচার হচ্ছে। আবার কোন কোন গাছ কেটে বনেই ফেলে রাখছে, সুযোগ বুঝে পাচার করছে চক্রটি।
দীর্ঘদিন ধরে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার সদর ইউনিয়নের চরযমুনা সংলগ্ন মাঝেরচরের সংরক্ষিত বন এভাবেই উজাড় হচ্ছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, একদিকে বন উজাড় হচ্ছে। আর অন্যদিকে উজাড় করা বনভ‚মির জমি দখল করে মাছের ঘেরের আয়তন বড় করছে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল। কিন্তু সব দেখেও বন রক্ষাকারী ‘বন বিভাগ’ বন রক্ষায় উদাসীন।
সরেজমিনে দেগা গেছে, গাছ কাটার আলামত লুকাতে কোন গাছের গোড়া ও শাসমূলক দিয়েছে মাটিচাপা। আবার কোনটির গোড়া ডেকে রেখেছে শিকড়-বাকড় দিয়ে। এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, চক্রটি গাছ কেটে একসঙ্গে পাচার করতে না পারলে আশপাশের বাড়ির পুকুর ও মাছের ঘেরে লুকিয়ে রাখছে। কেটে ফেলে রাখা সেসব গাছের টুকরো (গুড়ি) কিংবা ডাল-পালা প্রকাশ্যে হরিলুটও হচ্ছে। গাছের টুকরো হরিলুটের এমন চিত্র ধরা পড়েছে প্রতিবেদকের ক্যামেরায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গাছ কাটার বিষয়ে কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে ফাঁসাতে তার বাড়ির পুকুর কিংবা মাছের ঘেরেই ফেলে রাখছে কাটা গাছের টুকরো। চরযমুনার একটি ঘের পরিচালনার দায়িত্বে থাকা হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আমার ঘেরে ৩০ থেকে ৩৫টি গাছ ফেলে রাখছে। পরিকল্পিতভাবে আমাকে ফাঁসাতে গাছগুলো ঘেরে ফেলে রাখা হয়েছে। কাটা গাছের কষের কারণে আমার ঘেরের অনেক মাছ মারা গেছে। আমি এর বিচার চাই।’ স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ী জাকারিয়া বলেন, ‘আমরা উপক‚লীয় এলাকার লোকজন। প্রতিবছরই ঝড়-বন্যাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হই। এই বাগান আমাদের অভিভাবক তথা ঢাল স্বরূপ। এই বাগানের কারণে আমরা অনেক ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাই। কিন্তু দিনদিন এই বাগান উজাড় করে নিয়ে যাচ্ছে একটা মহল। রাতের আধারে গাছ কেটে বিক্রি করে। জমি দখল করে যেভাবে নিয়ে যাচ্ছে, একটা সময় এই বাগান থাকবে না। এই বাগান আমাদের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে। পশু-পাখিদের অভয়াশ্রম এই বাগান। বন না থাকলে পাখপাখালি থাকবে না। তাই বন রক্ষায় সবার এগিয়ে আসা উচিত।’
এলাকাবাসীর অভিযোগ, একদিকে বন উজাড় হচ্ছে। আর অন্যদিকে উজাড় করা বনভ‚মির জমি দখল হচ্ছে। সম্প্রতি উজাড় করা বনভ‚মির জমি দখল করে জুয়েল সিকদার নামের স্থানীয় এক ব্যক্তির মালিকানাধীন মাছের ঘেরের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ বাড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানান, ২০২০ সাল থেকে বনায়ন ধ্বংসের মাত্রা বেড়েছে। ধ্বংস করা বনায়নের জমি দখল করে তখন আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় মাছের ঘের করেছিলেন এই জুয়েল সিকদার। আওয়ামী লীগের পতন ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও জুয়েলের দৌরাত্ম থামেনি। বর্তমানে বিএনপির নাম ভাঙিয়ে জুয়েল সিকদার বনের জমি দখল করে নতুন বাঁধ নির্মাণ করে তার ঘেরের আয়তন বাড়িয়েছেন। ঘেরের পানি নিষ্কাশনের জন্য বনের মধ্যে ভেকু মেশিন দিয়ে তৈরি করেছেন নালা ও কালভার্ট । তাই বন উজাড় হওয়ার পেছনে জুয়েল সম্পৃক্ত আছে বলে অভিযোগ স্থানীয় মানুষের।
চরযমুনা গ্রামের বাসিন্দা সমাজকর্মী মামুন মাঝি বলেন, ‘আগে থেকেই এই চক্রটি বনের গাছ কেটে ঘের বড় করে আসছে। ২০২০ সালে যখন ঘের করেছিল তখন প্রায় দেড় একর বনের জমি দখল করেছিল। এ বছরও ৩০-৪০ ফুট বাগানের ভিতরে দিয়ে বাঁধ নির্মাণ করেছে। কৌশলে গাছ মেরে এভাবেই নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে আসছে। এমনকি বাগানের ভেতর ভেকু দিয়ে নালা কেটেছে, তাদের ঘেরের পানি ওঠানো-নামানোর জন্য।’ স্থানীয়দের তথ্যমতে, জুয়েলের মাছের ঘেরের মধ্যে এখনও অসংখ্য কাটা গাছের অবশিষ্ট অংশ পড়ে আছে। নতুন বাঁধ নির্মাণ করতে গিয়েও অনেক গাছ কাটা পড়েছে। কিন্তু সব দেখে-জেনেও বন রক্ষাকারী বন বিভাগ অনেকটাই উদাসীন রয়েছে বলে দাবি তাদের।
তবে অভিযুক্ত ঘের মালিক জুয়েল সিকদার বলেন, ‘আমি যখন মাটি কাটছি তখন এলাকার লোকজন এবং বন বিভাগের লোকজন সবাই দেখছে। আমিতো চুরি করে ঘেরের মাটি কাটিনি। ওপেনে কাটছি। একটা গাছও আমার ঘেরের মধ্যে নাই। পারলে প্রমাণ করেন। আমাদের রেকর্ডি জমি ও বন্দোবস্ত নেওয়া চাষের জমিতে ঘের করছি। পারিবারিক শত্রতা আছে যাদের সাথে তারাই বাড়াবাড়ি করে আমার ক্ষতি করার জন্য।’
বন বিভাগের রাঙ্গাবালী রেঞ্জের কানকুনিপাড়া ফরেস্ট ক্যাম্পের আওতায় মাঝের চরের সংরক্ষিত এই বনাঞ্চল। এই ক্যাম্পের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নারায়ন চন্দ্র মজুমদার বলেন, বনের ভিতর নালার মত দেখছি। মাটি কাটার ভেকু মেশিন গিয়ে পাইনি। নিষেধ করে আসছি। বনের ভিতর যে আইল ছিলো সেটাই বড় করছে, তাতে বনের ভিতর ১০০ মিটার পড়ছে। আগে করলে করতে পারে। তবে আমার দায়িত্বকালে ঘের বড় করে নাই।’ প্রতিবেদকের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘গাছ কাটার বিষয়টি নজরে আসেনি। তবে ডাল-পালা এলাকার লোকজন নিয়ে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছে।’
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইকবাল হাসান বলেন, ‘মাঝেরচর এলাকায় সংরক্ষিত বনাঞ্চল কেটে মাছের ঘের করার বিষয়ে খবর পেয়েছি। বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তার সাথে আমরা শেয়ার করে ওই জায়গাগুলো পরিদর্শন করা হয়েছে। সরকারি জমি দখল করে যে মাছের ঘের করা হয়েছে, ওইগুলো উচ্ছেদের জন্য শিগগরই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সংরক্ষিত বনাঞ্চল আমাদের দেশের সম্পদ। প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্নভাবে বনায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সংরক্ষিত বনাঞ্চল ধ্বংস এবং অপব্যবহারের যে খবরগুলো আমরা পাচ্ছি, সেগুলো আমরা বিভাগীয় বন কর্মকর্তাসহ উর্ধ্বতণ কর্তৃপক্ষকে জানাবো। যারা এখানে দোষী আছে, সেটা যদি কোন সরকারি কর্মকর্তাও হয় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জানা গেছে, ৭০-৮০ দশকের দিকে চরযমুনার মাঝের চরে ছইলা-কেওড়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছের এই বনায়ন সৃজন করা হয়। প্রায় ৫০ বছরের পুরনো এ বনায়ন জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি পাখপাখালির আবা