মো: আবু সুফিয়ানঃ ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া সামরিক সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়। পরে ইরান পাল্টা হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠে। এর প্রভাব কেবল সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তেল ও গ্যাস সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের মতো আমদানি-নির্ভর অর্থনীতির জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। দেশে ব্যবহৃত প্রায় ৯০ শতাংশ জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়, আর এলপিজি গ্যাস সম্পূর্ণরুপে বিদেশের ওপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ব্যাহত হলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে। ইতোমধ্যে ঢাকার বিভিন্ন পেট্রল পাম্পে দীর্ঘ লাইন, তেল সংকটের আশঙ্কা এবং মূল্যস্ফীতির চাপ তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব আরও বহুমাত্রিক হতে পারে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, কৃষি খাতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, শিল্প ও গার্মেন্টস খাতে উৎপাদন কমে যাওয়া—এসবই অর্থনীতিকে ধীরগতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য-নির্ভর রেমিট্যান্স প্রবাহেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।
এছাড়া সার আমদানির ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে সারের বড় চালান আসে। এই সরবরাহ ব্যাহত হলে কৃষি উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব পড়বে, যা খাদ্য নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলতে পারে। একইভাবে মেডিকেল যন্ত্রপাতি ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের আমদানিতেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বমুখী। ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ১৫০ ডলারে পৌঁছালে বৈশ্বিক মন্দার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এদিকে জ্বালানি সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন দেশের সরকার কর্মীদের ওয়ার্ক ফ্রম হোম বা বাড়ি থেকে কাজ করার অনুমতি দিয়েছে, কর্মসপ্তাহ কমিয়ে এনেছে, জাতীয় ছুটি ঘোষণা করেছে বা তড়িঘড়ি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে।
বাংলাদেশের সরকার অবশ্য দাবি করছে, দেশে জ্বালানি তেলের মজুত ও সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে এবং কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এই সিন্ডিকেট চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
এদিকে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের মধ্যে পড়াশোনার গতি সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ দুটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এখন থেকে সপ্তাহে ছয় দিন ক্লাস হবে। এর অর্ধেক (তিন দিন) হবে অনলাইনে এবং বাকি অর্ধেক (তিন দিন) সরাসরি শ্রেণিকক্ষে।
এ সংকট মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় জ্বালানি ব্যবহার কমানো, বিদ্যুতের অপচয় রোধ এবং অযথা মজুত না করার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
সর্বোপরি, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যত দ্রুত নিরসন হবে, ততই বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনীতির জন্য মঙ্গলজনক। অন্যথায়, এই তেল সংকট একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জে রূপ নিতে পারে।
..