নবীনগরে সূর্যমুখীর চাষে কৃষিতে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

নবীনগরে সূর্যমুখীর চাষে কৃষিতে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
লাউরফতেহপুর ইউনিয়নের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা মাহমুদুল হাসান (মাঝে) সড়কের পাশের প্রায় তিন বিঘা জমিতে সূর্যমুখীর আবাদ করে ইতোমধ্যেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন-ছবিঃ শাহীন রেজা টিটু

শাহীন রেজা টিটু-ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলায় এবার যেন নতুন স্বপ্নের বীজ বোনা হয়েছে সূর্যমুখীর হলুদ রঙে। একটি পৌরসভা ও ২১টি ইউনিয়নজুড়ে চলতি মৌসুমে প্রায় ২৫০ বিঘা জমিতে সূর্যমুখীর আবাদ কৃষিক্ষেত্রে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।

দেশে ভোজ্যতেলের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানো এবং কৃষকদের লাভজনক বিকল্প ফসলের দিকে আগ্রহী করে তুলতে সরকারের প্রণোদনা কর্মসূচি ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নানা উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কৃষকদের প্রশিক্ষণ, উন্নত মানের বীজ ও সার সরবরাহ, পাশাপাশি সার্বক্ষণিক কারিগরি সহায়তা—সব মিলিয়ে সূর্যমুখী চাষ এখন আর কেবল পরীক্ষামূলক নয়, বরং বাস্তব সম্ভাবনার পথে এগিয়ে চলা এক সফল উদ্যোগ।

কৃষি বিভাগ জানায়, সূর্যমুখী একটি উচ্চ সম্ভাবনাময় তেলবীজ ফসল, যার বীজে প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত তেল থাকে। সঠিক পরিচর্যা ও অনুকূল আবহাওয়ায় বিঘাপ্রতি ৪ থেকে ৫ মন পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব। সেই হিসেবে প্রতি বিঘা জমি থেকেই উৎপাদিত হতে পারে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ লিটার ভোজ্যতেল—যা কৃষকদের জন্য আর্থিকভাবে অত্যন্ত লাভজনক।

সরেজমিনে উপজেলার লাউরফতেহপুর, ইব্রাহিমপুর, বীরগাঁও ও নাটঘর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে দেখা যায় সূর্যমুখীর সোনালি সমারোহ। ক্লাস্টার আকারে গড়ে ওঠা এই চাষাবাদ এখন শুধু কৃষির ক্ষেত্রেই নয়, হয়ে উঠেছে নান্দনিক সৌন্দর্যেরও এক অনন্য উদাহরণ। বিকেলের নরম আলোয় দুলতে থাকা সূর্যমুখীর মাঠে ভিড় করছেন নানা বয়সী মানুষ—কেউ প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করছেন, কেউবা স্মৃতি বন্দি করছেন ক্যামেরায়।

নবীনগর পৌরসভার দোলাবাড়ি এলাকার কৃষক আব্দুল মান্নান এ বছর প্রথমবারের মতো এক বিঘা জমিতে সূর্যমুখীর চাষ করেছেন। কৃষি বিভাগের পরামর্শে ধানের বিকল্প হিসেবে এই চাষে আগ্রহী হয়ে তিনি আশাবাদী কণ্ঠে বলেন, “গাছে এখন দানা ধরছে, ফলন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা দেখছি।”

নবীনগর পৌরসভার দোলাবাড়ি এলাকার কৃষক আব্দুল মান্নান এ বছর প্রথমবারের মতো এক বিঘা জমিতে সূর্যমুখীর চাষ করেছেন-ছবিঃ শাহীন রেজা টিটু

 

অন্যদিকে, লাউরফতেহপুর ইউনিয়নের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা মাহমুদুল হাসান সড়কের পাশের প্রায় তিন বিঘা জমিতে সূর্যমুখীর আবাদ করে ইতোমধ্যেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি জানান, “বছরের শুরুতেই কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরামর্শ করে চাষ শুরু করেছি। বীজ ও কারিগরি সহায়তা পেয়েছি। আশা করছি ভালো ফলন হবে এবং তেল উৎপাদন করে বাজারজাত করতে পারব”

কৃষকদের মতে, ধানের পাশাপাশি সূর্যমুখী চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে একদিকে যেমন তাদের আয় বাড়বে, অন্যদিকে দেশীয়ভাবে ভোজ্যতেল উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।

এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. জাহাঙ্গীর আলম লিটন বলেন, “সূর্যমুখীর তেলে রয়েছে ভিটামিন-ই এবং স্বাস্থ্যকর অসম্পৃক্ত ফ্যাট, যা রক্তের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস করে। এছাড়া এতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকায় এটি স্বাস্থ্যসম্মত রান্নার তেল হিসেবে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।”
তিনি আরও জানান, সূর্যমুখী চাষ সম্প্রসারণে কৃষি বিভাগ নিয়মিত প্রশিক্ষণ, মাঠপর্যায়ে পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এই আবাদ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, নবীনগরের মাঠে ফুটে ওঠা সূর্যমুখীর এই সোনালি হাসি শুধু প্রকৃতির নয়—এটি কৃষকের আশা, সম্ভাবনা আর দেশের অর্থনীতির এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি নবীনগর পৌরসভার দোলাবাড়ি এলাকার কৃষক আব্দুল মান্নান এ বছর প্রথমবারের মতো এক বিঘা জমিতে সূর্যমুখীর চাষ করেছেন, লাউরফতেহপুর ইউনিয়নের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা মাহমুদুল হাসান সড়কের পাশের প্রায় তিন বিঘা জমিতে সূর্যমুখীর আবাদ করে ইতোমধ্যেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন

 

..

Leave a reply

Minimum length: 20 characters ::