আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধ তৃতীয় সপ্তাহে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারে আগুন লেগেছে। গত রোববার সন্ধ্যায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ২০২২ সালের জুলাই মাসের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ‘ব্রেন্ট ক্রুড’ তেলের দাম ২.৯ শতাংশ বেড়ে ১০৬.১২ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন অপরিশোধিত তেলের দাম ২.৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১০১.৫৩ ডলারে পৌঁছেছে।
ট্রাম্প প্রশাসন ইঙ্গিত দিয়েছে যে, এই সংঘাত আরও কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয় ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন সরু জলপথ ‘হরমুজ প্রণালী’ দিয়ে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই এই গুরুত্বপূর্ণ পথ দিয়ে তেলবাহী ট্যাঙ্কারের চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় ইতিহাসের অন্যতম বড় বিঘ্ন ঘটেছে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পথ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে তেলের দাম কোথায় পৌঁছাবে তা বলা মুশকিল।
গত রোববার এক পর্যায়ে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছে গিয়েছিল, যদিও পরে তা ১০০ ডলারের আশেপাশে স্থিতিশীল হয়।
ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০৬ ডলারে পৌঁছানোর ফলে বিমান ও পরিবহন সংস্থাগুলো বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও বিশ্বজুড়ে এই রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ যাত্রীদের যাতায়াত খরচকে আকাশছোঁয়া করে তুলেছে।
তেল সরবরাহ নিয়ে বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া উদ্বেগ কমানোর চেষ্টা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেলবাহী জাহাজগুলোকে নিরাপদে বের করতে মার্কিন নৌবাহিনী পাহারার ব্যবস্থা করবে। তবে প্রশাসন সম্প্রতি স্বীকার করেছে যে, নৌবাহিনীকে পুরোপুরি প্রস্তুত করতে আরও কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
শনিবার নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ তিনি বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর সহায়তা চেয়েছেন যাতে সবার সমন্বিত প্রচেষ্টায় এই জলপথ দ্রুত খোলা সম্ভব হয়।

সংঘাতের তীব্রতা বাড়িয়ে ইরানও পাল্টা চাপ সৃষ্টি করছে। তারা হরমুজ প্রণালিতে সমুদ্র-মাইন বসিয়েছে এবং হুমকি দিয়েছে যে, আমেরিকার সঙ্গে সম্পৃক্ত যেকোনো তেল ও গ্যাস স্থাপনে তারা হামলা চালাবে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই এই প্রণালিতে বেশ কিছু তেলবাহী ট্যাঙ্কার হামলার শিকার হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রধান তেল উৎপাদন কেন্দ্র ‘খার্গ আইল্যান্ড’-এ ব্যাপক বোমাবর্ষণ করেছে। তবে, ট্রাম্প প্রশাসন কৌশলগত কারণে আপাতত ইরানের তেলের খনিগুলোকে সরাসরি ধ্বংস করা থেকে বিরত রয়েছে।
বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল সরবরাহকারী এই সরু জলপথ মাইন আতঙ্কের কারণে কার্যত অচল। এই পথ বন্ধ থাকায় কেবল তেলের বাজারই নয়, বরং কৃষিকাজের অপরিহার্য উপাদান সার সরবরাহও বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে। ফলে পরিবহন ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়া ছাড়াও বিশ্বজুড়ে কৃষি উৎপাদন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ট্রাম্প প্রশাসন আমেরিকার নিজস্ব তেল উৎপাদন বাড়িয়েছে। গত শনিবার মেক্সিকো উপসাগরে ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম (BP)-এর একটি নতুন প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে। ২০১০ সালের বিপর্যয়ের পর এটিই সেখানে বিপি-র প্রথম বড় প্রকল্প।
সাথে সাথে ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলে বন্ধ থাকা তেল খনিগুলো পুনরায় চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA) তাদের জরুরি মজুত থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা মার্চ মাসের শেষের দিকে বাজারে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম হু হু করে বাড়ছে। আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন (AAA)-এর তথ্যমতে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশটিতে গ্যাসের দাম গড়ে ২৪ শতাংশ বেড়ে গ্যালন প্রতি ৩.৭০ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
এই ঊর্ধ্বগতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার দ্বিতীয় মেয়াদে গত ডিসেম্বরে তেলের দাম ৩ ডলারের নিচে নেমে এসেছিল, যা ছিল বড় একটি সাফল্য। এখনকার এই চড়া দাম সেই অর্জনকে ম্লান করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে।
জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে দুগ্ধজাত পণ্য, ফল ও মাছের মতো দ্রুত পচনশীল পণ্যের পরিবহন খরচ ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। যদি বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা দ্রুত সচল না হয়, তবে এই তেলের সংকট খুব দ্রুতই বৈশ্বিক খাদ্য সংকটে রূপ নিতে পারে।

হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার প্রভাব কেবল তেলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বজুড়ে কৃষকরা সারের জন্য এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল। সার সরবরাহ ব্যাহত হলে কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যার ফলে নিত্যপণ্যের দাম সরাসরি বাড়তে পারে।
সাথে সাথে জাহাজযোগে আসা পচনশীল পণ্য—যেমন দুগ্ধজাত দ্রব্য, ফলমূল, শাকসবজি ও মাছের দাম সবার আগে বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে তেলের সংকটের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে এক ভয়াবহ খাদ্য মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে।
সূত্র : ঢাকা পোষ্ট
..