আন্তর্জাতিক ডেস্ক : গত ২৮ ফেব্রুয়ারি গাজার বাসিন্দা লামা আবু রেইদা তার অসুস্থ শিশু কন্যা আলমাকে নিয়ে আশায় ছিলেন—হয়তো এবার তার ভাগ্য বদলাবে। মাত্র পাঁচ মাসেরও কম বয়সী এই শিশুটি অক্সিজেন মেশিন ছাড়া শ্বাস নিতে পারে না।
পরিবারটি অবশেষে জানতে পেরেছিল যে আলমা চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার অনুমতি পেয়েছে। ছোট একটি ভ্রমণ ব্যাগ গুছিয়ে রাখা হয়েছিল, চিকিৎসা সংক্রান্ত নথিপত্রও প্রস্তুত ছিল। আবু রেইদা প্রস্তুত ছিলেন রওনা হওয়ার জন্য। পরিকল্পনা ছিল গাজার রাফাহ ক্রসিং দিয়ে মিশরে প্রবেশ করা এবং সেখান থেকে জর্ডানে যাওয়া, যেখানে আলমার এমন একটি অস্ত্রোপচার করা সম্ভব যা গাজা উপত্যকায় করা যায় না।
কিন্তু নির্ধারিত ১ মার্চের যাত্রার ঠিক একদিন আগে ইসরায়েল নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত’ গাজার সব ক্রসিং বন্ধ করে দেয়। এই সিদ্ধান্তটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের ওপর যৌথ সামরিক হামলা শুরুর সময়ের সঙ্গে মিলে যায় এবং এতে ভেঙে যায় আবু রেইদার সব আশা।
আবু রেইদা বলেন,
“তারা আমাকে জানিয়েছে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে কোনো পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই ক্রসিং বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।”
ফুসফুসে সিস্ট থাকা আলমা গত তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। তার মা দিনরাত তার পাশেই থাকেন।
আবু রেইদা বলেন,
“সে একদমই অক্সিজেন ছাড়া থাকতে পারে না। অক্সিজেন না থাকলে সে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ে।”
গাজার বাইরের বিশ্বের সঙ্গে প্রধান যোগাযোগপথ রাফাহ ক্রসিং। ২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের সময় এটি দীর্ঘ সময় বন্ধ ছিল।
চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল হামাসের সঙ্গে একটি যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে পরীক্ষামূলকভাবে সীমিত আকারে ক্রসিংটি খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেয়। এর ফলে বিশেষ করে চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু রোগীর চলাচলের সুযোগ তৈরি হয়।
তবে খুব অল্পসংখ্যক রোগীই ভ্রমণ করতে পেরেছিলেন। হাজার হাজার রোগী অপেক্ষমাণ তালিকায় থেকে যান। ২৮ ফেব্রুয়ারি ক্রসিং আবার বন্ধ হয়ে গেলে আহত রোগীদের বিদেশে পাঠানো এবং আলমার মতো রোগীদের চিকিৎসার জন্য সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
চিকিৎসকেরা পরিবারকে জানিয়েছেন, আলমার ফুসফুসের সিস্ট অপসারণের জন্য বিদেশে অস্ত্রোপচার করানোই একমাত্র উপায়। যদিও অপারেশনটি খুব ঝুঁকিপূর্ণ নয়, কিন্তু সীমিত চিকিৎসা সুবিধার কারণে গাজায় এটি করা সম্ভব নয়।
আবু রেইদা বলেন,
“আমার মেয়ের জীবন একটি অস্ত্রোপচারের ওপর নির্ভর করছে। অপারেশনটি হলে সে একেবারে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবে।”তিনি আরও বলেন,
“যদি তার ভ্রমণ আরও দেরি হয়… আমি জানি না কী হতে পারে। তার অবস্থা মোটেও আশ্বস্ত করার মতো নয়।”
রোববার ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বুধবার থেকে সীমিত আকারে উভয় দিকেই মানুষের চলাচলের জন্য রাফাহ ক্রসিং আবার খোলা হবে।

যে আশঙ্কা আবু রেইদা করছেন, সেটিই ইতোমধ্যে বাস্তব হয়েছে হাদিল জোরোবের জীবনে।
৩২ বছর বয়সী এই মায়ের ছয় বছর বয়সী ছেলে সোহাইব ২০২৫ সালের ১ মার্চ মারা যায়। আর তার আট বছর বয়সী মেয়ে লানা গত মাসের ১৮ ফেব্রুয়ারি মারা যায়। তারা দুজনই একটি বিরল জেনেটিক রোগে ভুগছিল, যা ধীরে ধীরে শরীরের বিভিন্ন কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দেয়।
তাদের বিদেশে চিকিৎসার জন্য পাঠানোর অপেক্ষায় রাখা হয়েছিল। কিন্তু সেই সুযোগ আর আসেনি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে জোরোব বলেন,
“আমি আমার সন্তানদের একের পর এক চোখের সামনে ধীরে ধীরে মারা যেতে দেখেছি, অথচ কিছুই করতে পারিনি।”
লানা মৃত্যুর আগে মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে বিদেশে যাওয়ার কথা ছিল।
জোরোব বলেন,
“আমার মেয়ের যাত্রা ঠিক সেই সময়ে নির্ধারিত ছিল যখন পরে ক্রসিং বন্ধ করা হয়। কিন্তু তার আগেই সে মারা যায়।”
ক্রসিং বন্ধ হওয়ার খবর শুনে তার মেয়ের মৃত্যু আবারও মনে পড়ে যায়।
তিনি বলেন,
“যখন ক্রসিং বন্ধের খবর শুনলাম, তখন মনে পড়ল কত শিশু একই পরিণতির শিকার হবে।”
যুদ্ধের আগে দুই শিশুই নিয়মিত চিকিৎসা পেত। এতে তাদের অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু ইসরায়েলের হামলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতি হতে থাকে।
গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় প্রয়োজনীয় ওষুধও পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
জোরোব বলেন,
“আমরা পশ্চিম তীর থেকে ওষুধ আনার চেষ্টা করেছি। রেড ক্রস এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছেও অনুরোধ করেছি, কিন্তু কিছুই কাজ করেনি।”
যুদ্ধের সময় তাদের বাড়ি ছেড়ে আল-মাওয়াসি এলাকায় একটি তাবুতে আশ্রয় নিতে হয়। সেখানে শিশুদের দেখাশোনা করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন,
“দুজনই শয্যাশায়ী ছিল… ডায়াপার ব্যবহার করত। নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা করতে হতো। তরল খাবার দিতে হতো এবং খাবারের দিকে নজর রাখতে হতো—সবকিছুই করতে হয়েছে একটি তাবুর মধ্যে, যেখানে কোনো মৌলিক সুবিধা ছিল না।”
জোরোব বলেন, যদি তারা বিদেশে চিকিৎসা পেত, তাহলে হয়তো তার সন্তানরা বেঁচে থাকতে পারত।
তিনি বলেন,
“ক্রসিং বন্ধই আমার সন্তানদের হত্যা করেছে। আমাদের জীবন কিংবা আমাদের সন্তানদের জীবনের কোনো মূল্যই যেন বিশ্বের কাছে নেই।”
তবে তিনি এখনো তার চার বছর বয়সী মেয়ে লাইয়ানের জন্য শক্ত থাকার চেষ্টা করছেন।
তিনি বলেন,
“আমি শুধু চাই আমার সন্তানদের সঙ্গে যা হয়েছে তা যেন আর কোনো মায়ের সঙ্গে না হয়… সীমান্ত যেন আবার খুলে দেওয়া হয় এবং শিশু ও রোগীদের ভ্রমণের সুযোগ দেওয়া হয়।”
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ২০ হাজারের বেশি রোগী ও আহত ব্যক্তি বিদেশে চিকিৎসার জন্য অপেক্ষা করছেন।
এর মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ক্যানসার রোগী রয়েছেন, যাদের বিশেষায়িত চিকিৎসা গাজায় নেই। এছাড়া প্রায় ৪ হাজার ৫০০ শিশু রয়েছে।
তালিকায় প্রায় ৪৪০টি জীবনরক্ষাকারী জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা থাকা রোগীও রয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৬ হাজার আহত ব্যক্তি আছেন যাদের বিদেশে হাসপাতাল চিকিৎসা প্রয়োজন।
মানবাধিকার সংস্থা আল-দামির অ্যাসোসিয়েশন বলেছে, রাফাহ ক্রসিং বন্ধ রাখা গাজার বেসামরিক জনগণের ওপর সমষ্টিগত শাস্তির শামিল। এতে আরও অনেক রোগী মৃত্যুর মুখে পড়তে পারেন এবং গাজার মানবিক সংকট আরও গভীর হচ্ছে।

আমাল আল-তালৌলি নামের ৪৩ বছর বয়সী এক নারী পাঁচ বছর ধরে স্তন ক্যানসারে ভুগছেন। যুদ্ধের আগে তিনি চিকিৎসা নিলেও পরে রোগটি আবার ফিরে আসে এবং শরীরের অন্যান্য অংশে, বিশেষ করে মেরুদণ্ডে ছড়িয়ে পড়ে।
দুই সন্তানের মা আল-তালৌলি বলেন,
“আলহামদুলিল্লাহ, আমরা আমাদের ভাগ্য মেনে নিই। কিন্তু কেন সীমান্ত বন্ধ থাকার কারণে আমাদের কষ্ট আরও বাড়বে?”
যুদ্ধের সময় উত্তর গাজার বেইত লাহিয়া এলাকায় তার বাড়ি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তিনি এখন আত্মীয়দের সঙ্গে বসবাস করছেন।
তিনি বলেন, তার অসুস্থতার কারণে স্থানান্তর হওয়াও সহজ ছিল না। পাশাপাশি গাজায় ওষুধ এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তীব্র সংকট রয়েছে।
তিনি বলেন,
“সবকিছুরই অভাব রয়েছে। কেমোথেরাপির কারণে আমার অস্টিওপোরোসিস হয়েছে এবং চোখে পানি জমেছে। কেমোথেরাপির সময় ভালো পুষ্টিকর খাবার দরকার, কিন্তু অপুষ্টি ও দুর্ভিক্ষের কারণে তা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।”
ক্রসিং বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে বলে জানান তিনি।
আল-তালৌলি বলেন,
“এটি আমাদের খুবই ক্ষতিগ্রস্ত করছে। কোনো ওষুধ ঢুকছে না, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও আসছে না।”
বিদেশে চিকিৎসার অপেক্ষমাণ তালিকায় তার নামও রয়েছে।
তিনি বলেন,
“এখন আমি শুধু চাই সীমান্ত আবার খুলে দেওয়া হোক, যাতে সুস্থ হওয়ার সুযোগ পাই এবং আমার সন্তানদের সঙ্গে জীবন চালিয়ে যেতে পারি। এটা কি খুব বেশি চাওয়া?”
সূত্র: আল জাজিরা
..