সমাচার ডেস্ক: দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতিতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ। ঢাকায় বেইজিংয়ের কূটনীতিক ও কর্মকর্তাদের তৎপরতা চিন্তায় ফেলেছে ওয়াশিংটনকে। এ কারণে বাংলাদেশের নির্বাচিত নতুন সরকারকে চীনা সামগ্রীর বিকল্প হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে মার্কিন প্রশাসন। খবর রয়টার্সের।
২০২৪ সালের আগস্টে জেন-জি নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থানে ভারতপন্থি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। হাসিনা বর্তমানে নয়াদিল্লিতে আশ্রয়ে আছেন, যার কারণে এই ভূখণ্ডে কমে গেছে ভারতের প্রভাব। এই সুযোগ চীনকে বাংলাদেশে তাদের প্রভাব বাড়ানোর পথ প্রশস্ত করে দিয়েছে।
সম্প্রতি চীন বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত সীমান্তের কাছে একটি ড্রোন কারখানা তৈরির প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যা বিদেশি কূটনীতিকদের ভাবিয়ে তুলেছে। এছাড়া পাকিস্তান ও চীনের যৌথভাবে তৈরি জেএফ-১৭ থান্ডার মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়েও পাকিস্তানের সঙ্গে কথা বলছে বাংলাদেশ।
গত মঙ্গলবার এক সাক্ষাৎকারে ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান চীনা প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন এবং চীনের সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু চুক্তির ঝুঁকিগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
বিস্তারিত কোনো তথ্য না দিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতার চাহিদা মেটাতে যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব এবং তার অংশীদারদের বিভিন্ন বিকল্প অফার করছে, যাতে চীনা যন্ত্রের বিকল্প পাওয়া যায়।’
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি জানায়, ব্যাপক কৌশলগত অংশীদার হিসেবে চীন ও বাংলাদেশ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একে অপরকে সহযোগিতা করেছে, যা উভয় দেশের জন্যই উপকারী।
এছাড়া এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয়টি জানায়, ‘আমাদের পারস্পরিক উপকারী এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা কোনো তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে নয় এবং একই সঙ্গে আমরা অন্য কোনো পক্ষের হস্তক্ষেপ সহ্য করব না।’
ক্রিস্টেনসেন আরো বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ‘আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সুসম্পর্ক দেখতে চায়’।
হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের অবনতি হচ্ছে, যা ভিসা পরিষেবা এবং দুই প্রতিবেশীর ক্রিকেট সম্পর্কের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
রাষ্ট্রদূত জানান, অনেক মার্কিন ব্যবসায়ী বাংলাদেশে বিনিয়োগের কথা ভাবছে, তবে তারা পরবর্তী সরকারের কাছ থেকে এমন প্রাথমিক ও স্পষ্ট লক্ষণ দেখতে চায় যে বাংলাদেশ ‘ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত’।
তিনি বলেন, ‘বাণিজ্যিক কূটনীতি আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে যে অগ্রগতি হয়েছে, বিশেষ করে বাণিজ্য, অর্থনীতি ও নিরাপত্তা সম্পর্ক শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে, নির্বাচিত নতুন সরকারের সঙ্গেও আমরা তা এগিয়ে নিতে চাই।’
জ্বালানি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান শেভরন কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে থাকলেও উচ্চ কর এবং মুনাফা নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার সমস্যার কারণে ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের এই ঘনবসতিপূর্ণ দেশে খুব বেশি মার্কিন কোম্পানি দেখা যায় না। এছাড়া বাংলাদেশে এখনও কোনো স্টারবাকস বা ম্যাকডোনাল্ডসের শাখা নেই।
রাষ্ট্রদূত স্পষ্ট করেন যে, ওয়াশিংটন ‘বাংলাদেশের জনগণের নির্বাচিত যেকোনো সরকারের সঙ্গে’ কাজ করবে। এ নির্বাচনে মূল লড়াই হচ্ছে সাবেক মিত্র বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন দুটি জোটের মধ্যে। জনমত জরিপে বিএনপি কিছুটা এগিয়ে আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে ক্রিস্টেনসেন বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গা শরণার্থী সহায়তায় সবচেয়ে বড় অবদানকারী এবং বাংলাদেশে শক্তিশালী স্বাস্থ্য কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।’ তিনি সম্প্রতি জাতিসংঘের সঙ্গে হওয়া ২ বিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক অর্থায়ন কাঠামোর কথা উল্লেখ করেন, যা রোহিঙ্গা সহায়তার কার্যকরিতা বাড়াবে।
তিনি অন্যান্য আন্তর্জাতিক দাতাদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র একা এই বিশাল ভার বহন করতে পারবে না। আন্তর্জাতিক অংশীদারদের রোহিঙ্গা সহায়তায় তাদের অবদান বাড়ানো প্রয়োজন।’
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের জন্য পর্যাপ্ত তহবিল সংগ্রহ করতে হিমশিম খাচ্ছে, যার কারণে তাদের রেশনে কাটছাঁট এবং কিছু স্কুল বন্ধ করে দিতে হয়েছে।
..