গলাচিপা (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি: নির্বাচনের তারিখ ঘনিয়ে আসতেই উত্তাপ ছড়াচ্ছে পটুয়াখালী-৩ আসনের প্রার্থীদের মধ্যে। এ আসনে বিএনপি সমর্থিত ও গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হাসান মামুনের সাথে প্রচারণার শুরু থেকেই নির্বাচনী উত্তাপ চলে আসছিল। এরই ধারাবাহিকতায় পটুয়াখালী-৩ আসনে (গলাচিপা-দশমিনা) সোমবার রাতে দশমিনা উপজেলার চরবোহান ইউনিয়নে বিএনপি জোটের ও গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থী নুরুল হক নুর ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসান মামুনের সমর্থকদের মধ্যে হামলা এবং অফিস ভাংচুরের বিষয় সংবাদ অনুষ্ঠিত হয়। এ ঘটনায় মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টায় গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর গলাচিপা উপজেলা বিএনপির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন করেন।
সংবাদ স্মলনে নুরুল হক নুর বলেন, ‘গত পরশু ফেইজবুক লাইভে আমি বলেছিলাম, আমরা চিকনিকান্দি থেকে আসার পথে ডাকুয়ার স্লুইস বাজারের পাশে একটি জঙ্গল থেকে আমাদের পথরোধ করে ঘোড়া মার্কার শ্লোগান দেয়। এই জাতীয় নির্বাচনে যেহেতু একটি অপশক্তি নির্বাচনের পরিবেশ বানচারের জন্য দেশী বিদেশী অপশক্তি কাজ করছে। বেশ কিছু প্রার্থীকে এবং প্রার্থীর সাথে কাজ করে এমন কিছু সমর্থককে ঢাকা চট্রগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের হত্যা করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আমরাও একটা নিরাপত্তার শঙ্কায় আছি। তারপরেও দেশের স্বার্থে এই নির্বাচনকে উৎসবমুখর করার জন্য আমরা আমাদের ঝুঁকি নিয়েও নির্বাচনের মাঠে আছি। এই নির্বাচন বাংলাদেশের অস্তিত্বের সাথে জড়িত। এই নির্বাচন যদি সঠিক সময় না হয় তাহলে বাংলাদেশ বড় ধরণের বিপর্যয় পরবে। তাই আমরা আমাদের জায়গা থেকে দায়িত্বশীল আচরণ করছি। আমরা অন্যদেরকেও সহনশীল হওয়ার আহ্বান জানাই। কিন্তু আমরা লক্ষ করছি যে যিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন তিনি উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে বিভিন্ন ধরণের অশালীন এবং আক্রামনাক্তক বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি আলোচনায় থাকতে চান।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের নেতা কর্মীদেরকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। রাস্তাঘাট ও বাজারঘাটে দেখা হলে তাদের সাথে নানা ধরণের সংঘাত ও ঝামেলা করা হচ্ছে। গত পরশুদিন পানপট্টিতে লিফলেট দিয়ে যাওয়ার পথে আমাদের কর্মী রাকিবকে অতর্কিতভাবে হামলা করে মোটর সাইকেল ভাংচুর করে।’
নুর বলেন, গতকাল (সোমবার) আমি নিজে আলিপুরা গেছিলাম। আমি যখন গণসংযোগ করছিলাম আমাদের উপস্থিেিত আমাদের কর্মী চানমিয়াকে মারধর করে। পরে বলে টাকা পাবে। কিন্তু টাকা পাবে এর আগে কি করেছিল? এর পূর্বে চরকপালবেড়াও আমাদের নেতাকর্মীদের উপর হামলা করা হয়েছিল। চরকাপলবেড়া ও চরবোরহানগুলোতে ভূমি দস্যুদের আধিপত্য রয়েছে। এ ভূমিদস্যুরা হাসান মামুনের আশ্রয়ে রয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘গত ৫ আগস্টের পর থেকে বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সরকারি যেসকল সুবিধাভোগী রয়েছে এসব ক্ষেতে চেয়ারম্যান মেম্বরদেরকে ভয়ভীতি দেখিয়ে তারাই নিয়ে গিয়েছে। অনেকেউ ভয়ে মুখ খুলতে পারেনি।’
নুর বলেন, চরবোরহানে বিএনপি ও গণ অধিকার পরিষদের নেতাকর্মীরা গণসংযোগ করতে গেলে সেখানে ট্রলার থেকে ওঠার সময় তারা অতর্কিত হামলা করে এবং গণ অধিকার পরিষদের কার্যালয় ভাংচুর করে। বিষয়টি সাথে সাথেই পুলিশ সুপারকে জানালে তারা পুলিশ পাঠানোর ব্যবস্থা নেয়। পুলিশ যাবে এই খবর পেয়েই তারা নিজেদের অফিস নিজেরাই ভাংচুরের একটি নাটক সাজায়। পরে তাদের নিজেদের করা একটি ভিডিও বিভিন্ন সংবাদকর্মীদের মাধ্যমে প্রচার করায়।’ তিনি সংবাদকর্মীদের নির্বাচনকালীন সময় ভুল সংবাদ যাচাই বাছাই করে প্রকাশ করার আহ্বান জানান। পরবর্তীতে ভুল সংবাদ প্রচারের জন্য সংবাদকর্মীরাই দায়ী থাকবেন বলে মন্তব্য করেন।
সংবাদ সম্বেলনে তিনি বলেন, ‘পুলিশ ব্যবস্থা নিতে নিতে রাত্র ১১টা পর্যন্ত গড়িয়েছে। ভোলা থেকেও বিভিন্ন সন্ত্রাসীরা এসেছিল। প্রথমে পুলিশ নিয়ন্ত্রণ নিতে ব্যর্থ হয়। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। নির্বাচনের পূর্বেই যদি এরকম একটি ঘটনা ঘটে যে আমাদের মতো বাংলাদেশে পরিচিত একটি দল নয়, জোটের প্রার্থী। আমাদের কর্মীদের সাথে এ অবস্থা হয়, সেখানে প্রশাসন সঠিক ব্যবস্থা না নিতে পারে তাহলে পরিস্থিতি অবনতির দিকে যাবে।’
নুর বলেন, ‘আমরা মনে করি নির্বাচন বানচাল করার জন্য দেশী বিদেশী অপশক্তি আমার এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর মাধ্যমে ব্যবহার করছে এবং করবে। আপনারা জানেন যে, তিনি বিভিন্ন বক্তব্যে (হাসান মামুন) তিনি ওপেনলি বলেছেন, এখানে ভিপি নুর এমপি হলে ২০ বছরেও যাবে না। তাই আমাদেরকে ঠেকানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। এর আগে বকুলবাড়িয়া এসা থেকে রাত্র তিনটা পর্যন্ত আমাদেরকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। সেখানেও কিন্তু পরিস্থিতি উত্তোরণের জন্য পুলিশ সেনা সদস্যরা গিয়েও কিন্তু রাত্র তিনটা বেজেছে। আমরাও কাউন্টার দিতে পারি। কিন্তু আমরা চাচ্ছি যে যে কোন পরিস্থিতি এলাকার পরিস্থিতি শান্ত থাকুক। একটা উৎসব থাকুক। কিন্তু স্বতন্ত্র প্রার্থী আমাদের কাছে মনে হচ্ছে বিদেশী শক্তি যারা নির্বাচন বানচাল করার কাজ করছে। নির্বাচন বানচাল করার জন্য হাত মিলিয়েছে। আমারা মনে হয় তার বাসাবাড়ি রেইড দিয়ে তার কালো টাকার বিষয়ে একটি অভিযান পরিচালনা করা দরকার। কারণ তিনি নেতৃবৃন্দকে পয়সা দিয়ে তার পক্ষে নামানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। কাজেই তার এ টাকার উৎস কী? তিনি প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করছে। এ বিষয়গুলো আমরা প্রশাসনকে বার বার ক্ষতিয়ে দেখার আহ্বান জানাই। গত তিন দিনের যে ঘটনার গলাচিপার দশমিনার হুমকি ধরমকির ঘটনা ঘটেছে আমরা প্রশাসনের কাছে তা লিখিত অভিযোগ জানাবো।’
নুর বলেন, ‘স্বতন্ত্র প্রার্থী তার উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক পরিচয় নাই। এ এলাকায় জনপদে মানুষের সাথে কাজ করছেন মানুষের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন সেরকম খুব বেশি ভালো রেকর্ড নাই। বরংচ তিনি একটি নৈতিক পরিপন্থী কাজ করছেন মেধাবীদের ধ্বংস করার জন্য পিএসসির প্রশ্ন ফাঁসসহ বিভিন্ন চাকরি বাকরির প্রশ্ন ফাঁস করে আসছেন। তিনি সেই প্রশ্ন ফাঁস চক্রের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন। এধরণে একজন ব্যক্তির প্রার্থী হওয়াটা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ভয়ঙ্কর ক্ষতিকর। সে জায়গা থেকে তিনি এখন নির্বাচনের পরিবেশকে উত্তপ্ত করার জন্য যে কাজগুলো করছেন। সেখানে প্রশাসন নীরব থাকলে বড় ধরণের বিপর্যয় ঘটতে পারে। যারা প্রশাসনকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে কথা বলতে পারে, তার পক্ষে যে কোন অপকর্ম করাই সম্ভব।
এসময় তিনি চর বোরহানের হামলা ভাংচুরের ভিডিও দেখিয়ে বলেন, আমাদের কার্যালয়ে মিছিল নিয়ে বাঁশ রামদা লাঠিসোটা নিয়ে আমার কার্যালয়ের সামনে গিয়ে অফিস ভাংচুরে করেছে। আমাদের নেতা কর্মীদের আক্রমণ করেছে। তারা নানান ধরণে গল্প বানায়। তার স্বপক্ষে কোন প্রমাণ নাই যুক্তিও নাই। তিনি বিএনপির নেতাকর্মীদেরকে হুমকি দিয়ে বেড়াচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত বেসরকারি বিশ্ব বিদ্যালয়ের সভাপতি এবং ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতিকে যে হুমকি দিয়েছে সে বিষয় উল্লেখ করেন। পরে হুরায়রা হাসান মামুনের সাথে ফোনালাপ অডিও প্রকাশ করেন। এসময় হুরায়রা বলেন, আমরা পার্টির নির্দেশে আমাদের যে নমিনি আছে তাদের সাথে কাজ করে যাচ্ছি। বিএনপির নেতা কর্মীরা আমাদের কাছে জানতে চাইছেন আমরা এখন কী করবো-আমি নুর ভাইয়ের সাথে কাজ করছে হবে বলে জানিয়ে দেই। এ কথা শুনেই কোন হাই কমান্ড আমাকে নির্দেশ দিয়েছে তা আমার কাছে জানতে চেয়েছেন (হাসান মামুন)। এর পর তিনি আমাকে হুমকি দেয়, ১২ তারিখের পর আমি এমপি হওয়ার পর তুমি কীভাবে দেশে থাকো আমি তা দেখে নিবো। একজন জুলাই যোদ্ধাকে একজন ছাত্র নেতাকে যদি এভাবে হুমকি দিতে পারেন তাহলে এখানকার যেসকল নেতাকর্মীরা রয়েছেন তাদেরকে হুমকি দিয়ে জিম্মি করে তার পক্ষে কাজ করতে বাধ্য করেছেন। বিএনপির নির্দেশনা মানতে দেওয়া হচ্ছে না। আমি শঙ্কিত আমি নির্বাচনে আমার প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে পারবো কি না।
এসময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, ছাত্র দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহসভাপতি ইকতিয়ার রহমান কবির, বেসরকারি বিশ্ব বিদ্যালয়ের সভাপতি আবু হুরায়রা, উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আলহাজ¦ গোলাম মোস্তফা, সাবেক সিনিয়র যুগ্ন আহ্বায়ক মো. সোবহান মিয়া, গণঅধিকার পরিষদের যুগ্ন আহ্বায়ক হাফিজুর রহমান, গণঅধিকার পরিষদের সদস্য সচিব মো. জাকির মুন্সী, ছাত্র অধিকা পরিষদের কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সভাপতি আবু নাইম, উপজেলা শ্রমিক অধিকার পরিষদের সভাপতি আমির হোসেন, সাধারণ সম্পাদক মো. নাজমুল হাসান, যুব অধিকার পরিষদের আহ্বায়ক রাসেল প্যাদা, সদস্য সচিব আবুল হোসেন, ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি মো. আরিফ বিল্লাহ প্রমুখ।
..